শহরের কোলাহল ছেড়ে গ্রাম থেকে অনেক দূরে ছোট্ট একটি ছিমছাম ফ্ল্যাট। সেখানে থাকেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ইব্রাহিম সাহেব ও তাঁর স্ত্রী রহিমা বেগম। বার্ধক্যের এই পড়ন্ত বেলায় তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হলো তাঁদের দুই সন্তান—বড় মেয়ে রিয়া এবং ছোট ছেলে রাহাত।
অনেকে বলে, মেয়ে তো বিয়ের পর অন্য বাড়ির হয়ে যায়, আবার কেউ বলে ছেলেই শুধু মা-বাবার শেষ ভরসা। কিন্তু ইব্রাহিম সাহেব ও রহিমা বেগম বরাবরই এই ধারণার উল্টোটা বিশ্বাস করতেন। তাঁদের কাছে ছেলে আর মেয়েতে কোনো তফাত ছিল না; দুজনেই ছিল তাঁদের সমান স্নেহের ও অধিকারের।
গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই ইব্রাহিম সাহেবের স্ট্রোক হয়। খবর পেতেই শহরের সরকারি চাকরিজীবী মেয়ে রিয়া অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ছুটে এল। আর ছোট ছেলে রাহাত, যে একটা বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করে, সেও সব কাজ ফেলে রাতারাতি মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল।
হাসপাতালের কেবিনের দৃশ্যটা দেখে যেকোনো মানুষের বুক ভরে যেত। একদিকে মেয়ে রিয়া বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে পরম যত্নে সেবা করছে, অন্যদিকে ছেলে রাহাত ডাক্তারদের সাথে কথা বলা, ওষুধ আনা এবং সমস্ত তদারকি সামলাচ্ছে। দুজনেই সমানভাবে নিজেদের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছে।
কয়েক দিন পর ইব্রাহিম সাহেব বাড়ি ফিরলেন। ডাক্তার বলেছেন নিয়মিত থেরাপি আর বিশেষ যত্ন দরকার। এই পরিস্থিতিতে কে মা-বাবার সাথে থাকবে, তা নিয়ে ভাই-বোনের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব হলো না। বরং দুজনেই এক বাক্যে সিদ্ধান্ত নিল। ছুটির দিনগুলোতে রাহাত এসে বাজারঘাট ও ভারী কাজগুলো গুছিয়ে দেয়, আর রিয়া তার অফিসের কাজের ফাঁকে বা ছুটির দিনগুলোতে এসে মায়ের রান্নায় সাহায্য করে এবং ঘরের পুরো দেখভাল করে।
এক রাতে বারান্দায় বসে রহিমা বেগম তাঁর স্বামী ইব্রাহিম সাহেবের চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “দেখছ তো গো, মানুষ বলে মেয়েরা পর হয়ে যায় আর ছেলেরা সব দেখাশোনা করে। আজ যদি আমাদের মেয়েটা সমানভাবে পাশে না দাঁড়াত, একা রাহাত কি সব সামলাতে পারত?”
ইব্রাহিম সাহেব মৃদু হেসে বললেন, “মা-বাবার কাছে সন্তান মানেই এক জোড়া ডানা। একটা ডানা ছাড়া যেমন পাখি উড়তে পারে না, তেমনি ছেলে বা মেয়ে—উভয়ের সমান ভালোবাসাই মা-বাবার শেষ বয়সের একমাত্র অবলম্বন।”
ঘরের ভেতর থেকে তখন রিয়া আর রাহাতের একসাথে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। ভাই-বোনের এই সমান ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ দেখে বারান্দায় বসে থাকা বয়স্ক বাবা-মায়ের বুকটা একরাশ প্রশান্তিতে ভরে গেল। তাঁরা বুঝতে পারলেন, রক্তের সম্পর্কে ছেলে বা মেয়ে বলে কিছু নেই; প্রকৃত সন্তান তারাই, যারা সুখে-দুঃখে ছায়ার মতো পাশে থাকে।
নোট: মা-বাবার কাছে ছেলে এবং মেয়ে—উভয়েই সমান ভালোবাসার আধার। সন্তানের সমান মমতা ও শ্রদ্ধাই বৃদ্ধাশ্রমের মতো অন্ধকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আলো।
এই গল্পটি কি আপনার প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়েছে, নাকি এতে আরও কোনো বিশেষ দিক যোগ করতে চান?
