নেইমার জুনিয়র—আধুনিক ফুটবলের অন্যতম রঙিন, অদ্ভুত এবং ট্র্যাজিক এক চরিত্রের নাম। একাধারে তার অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং দিয়ে কোটি ভক্তের মন জয় করা ফুটবল জাদুকর, অন্যদিকে বারবার ইনজুরি ও বিতর্কে ঘিরে থাকা এক ট্র্যাজিক হিরো। তার জীবন কোনো সিনেমার গল্পের চেয়ে কম নয়।
নিচে নেইমারের জীবনের বাস্তব কিছু ঘটনা ও মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অধ্যায় তুলে ধরা হলো:
১. মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা অলৌকিক শৈশব
১৯৯২ সালে ব্রাজিলের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নেইমার। মাত্র চার মাস বয়সে তিনি এবং তার বাবা এক মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হন। তাদের গাড়ি পাহাড়ের ঢাল দিয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। খুদে নেইমারকে রক্তের ফোঁটায় ভেসে থাকা অবস্থায় সিটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। অলৌকিকভাবে সে যাত্রা বেঁচে যান নেইমার, যা পরবর্তীতে বিশ্ব ফুটবলের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
২. সান্তোস ও ‘পেলের উত্তরসূরি’র উত্থান
সান্তোসের একাডেমি থেকে বেড়ে ওঠা নেইমার মাত্র ১৭ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে আত্মপ্রকাশ করেন। সাম্বা ফুটবলের মোহনীয় ড্রিবলিং, অসাধারণ গতি আর পায়ের জাদুতে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। তাকে সরাসরি কিংবদন্তি পেলের সাথে তুলনা করা শুরু হয়। ২০১১ সালে সান্তোসকে লিবার্তাদোরেস ট্রফি জেতানোর পর তাকে পেতে ইউরোপের জায়ান্ট ক্লাবগুলো কাড়াকাড়ি শুরু করে।
৩. বার্সেলোনা, ‘MSN’ ত্রয়ী ও ঐতিহাসিক ট্রেবল
২০১৩ সালে ইউরোপে পাড়ি জমিয়ে যোগ দেন বার্সেলোনায়। সেখানে লিওনেল মেসি এবং লুইস সুয়ারেজের সাথে গড়ে তোলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগ—‘MSN’।
২০১৪-১৫ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা, কোপা দেল রে এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে অর্জিত হয় ঐতিহাসিক ‘ট্রেবল’।
২০১৭ সালে পিএসজির বিরুদ্ধে বার্সেলোনার ঐতিহাসিক ‘Remontana’ (৬-১ ব্যবধানের জয়) ম্যাচে নেইমার একাই শেষ কয়েক মিনিটে খেলা ঘুরিয়ে দেন, যা তার ক্যারিয়ারের সেরা পারফর্ম্যান্সগুলোর একটি।
৪. পিএসজি ও বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার: ভালোবাসার আলো থেকে ছায়ায়
মেসির ছায়া থেকে বের হয়ে নিজেকে পৃথিবীর এক নম্বর ফুটবলার হিসেবে প্রমাণ করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে ২২২ মিলিয়ন ইউরো রেকর্ড ট্রান্সফার ফি-তে পিএসজিতে পাড়ি জমায় নেইমার। কিন্তু ফ্রান্সের এই অধ্যায়টি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময় হয়ে দাঁড়ায়:
প্রতিপক্ষের ফুটবলারদের কড়া ফাউল ও বারবার গুরুতর ইনজুরি।
পিএসজিকে ২০২০ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে তুললেও শিরোপা জিততে না পারা।
ক্লাবের ভেতরের রাজনীতি এবং সমর্থকদের সাথে দূরত্ব তৈরি হওয়া।
৫. জাতীয় দল ও ২০১৪ বিশ্বকাপ ট্র্যাজেডি
ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করলেও দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জেতাটা তার অধরাই থেকে যায়।
২০১৪ ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ: কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার জুনিগার বাজে ট্যাকলে নেইমারের কশেরুকা (মেরুদণ্ড) ভেঙে যায়। অল্পের জন্য তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়া থেকে বেঁচে যান। পরবর্তীতে সেমিফাইনালে ব্রাজিল জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়।
২০১৬ অলিম্পিক: দেশের মাটিতে ব্রাজিলকে প্রথমবারের মতো অলিম্পিক গোল্ড মেডেল এনে দিয়ে ঐতিহাসিক ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ দেন।
৬. সৌদি আরব, ইনজুরি ও জন্মভূমিতে ফেরা (সান্তোসে পুনরাগমন)
পিএসজি ছেড়ে সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলালে যোগ দেওয়ার পরপরই আবার হাঁটুর লিগামেন্ট (ACL) ইনজুরিতে পড়েন নেইমার। দীর্ঘ এক বছর মাঠের বাইরে কাটাতে হয়।
অবশেষে ২০২৫ সালে নিজের শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরে আসেন তিনি। সেখান থেকে সান্তোসকে অবনমনের হাত থেকে বাঁচানো এবং নিজের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় হিসেবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জার্সিতে আরেকবার সেরাটা দেওয়ার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
উপসংহার:
নেইমার এমন এক ফুটবলার, যাকে নিয়ে বিতর্ক কখনোই শেষ হয়নি। অনেকে তাকে বলবেন অপূর্ণ প্রতিভার গল্প, আবার অনেকেই বলবেন ফুটবল আনন্দের এক প্রতীক। তবে বাস্তব সত্যি হলো—সব বিতর্ক, হাজারো ইনজুরি আর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেও তিনি ফুটবলের সবুজ গালিচায় বিশুদ্ধ আনন্দ উপহার দিয়ে গেছেন।
